Home » রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি আলোচনা কর
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি আলোচনা কর

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি আলোচনা কর

by Susmi
0 comment

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি

সামাজিক বিজ্ঞানের একটি নবীন শাখা হিসেবে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান একটি স্বতন্ত্র ধারা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বিধায় অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের ন্যায় এটিরও নিজস্ব প্রকৃতি রয়েছে। পাশাপাশি এটি বিভিন্ন পরিবর্তনশীলতার মধ্য দিয়ে তার আপন মহিমায় অগ্রসর হচ্ছে, যা অন্যান্য বিজ্ঞান থেকে এটিকে ভিন্ন মর্যাদায় আসীন করেছে। আর এর সংজ্ঞাসমূহ বিশ্লেষণ করলে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি সম্পর্কে পরিচয় পাওয়া যায়। সেগুলো হলো-

১. মিশ্র সামাজিক বিজ্ঞান

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান এ দুটি শাখার সমন্বয়ে। সমাজের উৎপত্তি ও বিবর্তন এবং অন্যান্য সামাজিক দিক সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানের আলোচনা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহায়তা ছাড়া গভীরে যেতে পারে না। তাই সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের রাজনৈতিক জীবনপ্রণালি অধ্যয়নই এর মৌলিক বিষয়।

২. বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান বিভিন্ন প্রপঞ্চ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অবলম্বন করে। এ কারণেই এটি বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা সামাজিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র, রাজনৈতিক আচরণ, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক উদাসীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ইত্যাদি ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান বলতে কি বুঝ | রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও

৩. ব্যাখ্যার গভীরতা

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান সমাজ ও রাজনীতির ব্যাখ্যার গভীরে প্রবেশ করে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে যে, সমাজ ও সামাজিক গতিশীলতার প্রকৃতি, কাঠামো ও কার্যাবলি হচ্ছে সমাজের মৌলিক কাঠামো এবং এসবের উপরি কাঠামো হচ্ছে রাজনীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও কার্যাবলির প্রকৃতি। অর্থাৎ একটি দেশের বাজনীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও কার্যাবলি উন্নত না অনুন্নত সে বিশ্লেষণের গভীরে প্রবেশ করে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান।

৪. ক্ষমতার কাঠামো বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হলো সমাজের অভ্যন্তরে যে ক্ষমতা রয়েছে তার স্বরূপ বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করা। কেননা ক্ষমতার একটি সামাজিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। আর তাই রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার কাঠামো বিশ্লেষণ করে।

৫. তাত্ত্বিক বিজ্ঞান

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান শুরুর দিকে তাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ না করলেও বর্তমানে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র তাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে পশ্চিমা চিন্তাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে বাস্তববাদী চিন্তা-চেতনার ফলশ্রুতি হিসেবে বর্তমান সময়ে তাত্ত্বিক বিজ্ঞান হিসেবে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকাশ ঘটেছে।

৬. পরিবর্তনশীলতা

সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পরিবর্তিত হয়। যেমন- সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক আধিপত্য বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হলে তার প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের গতানুগতিক সমাজে ভাঙন ধরে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতাকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে বিশ্বব্যাপী রাজনীতি জাতি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক চরিত্র ধারণ করে। আর রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান এসব পরিবর্তন ধারণ করে আধুনিক রূপ লাভ করেছে। তাই রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি পরিবর্তনশীল।

৭. মূল্যবোধ নিরপেক্ষতা

সময়ের পরিবর্তনশীলতার কারণে কোন কালেই সমাজ ও রাজনীতির আলোচনা, গবেষণা কিংবা বিশ্লেষণের কাজটি কোন পণ্ডিতের পক্ষেই মূল্যবোধ নিরপেক্ষ থেকে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় নি। তা ছাড়া সমাজের অন্তর্ভুক্ত মানুষ হিসেবে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে নানা ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকেন। তাই অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের মতো রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের পক্ষে সম্পূর্ণ মূল্যবোধ নিরপেক্ষ হয়ে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা করা সম্ভব নয়। তাই রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতির পরিবর্তনশীলতার মতো এর মূল্যবোধও পরিবর্তনশীল তথা নিরপেক্ষ নয়।

৮. বহুরূপিতা

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান পরিস্থিতি ও প্রয়োজনমতো বিভিন্ন প্রপঞ্চের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন করে থাকে। পাশাপাশি ইতিহাসের মতো বিবরণধর্মী আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, আবার সুদ্ধ বিশ্লেষণের মাধ্যমে কার্যকারণ সম্পর্ক আবিষ্কার ও সূত্র উদ্ভাবনে সচেষ্ট হয়। আর এ কারণেই রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান উপনিবেশবাদ, উপনিবেশবাদ বিরোধী আন্দোলন, বর্ণবাদ, সামাজিক স্তরবিন্যাস ইত্যাদি সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনোগত দিকগুলো একই সাথে ধারণ করে। সুতরাং রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের চরিত্র বহুমাত্রিক তথা একই অঙ্গে অনেক রূপের সমাহার।

৯. কার্যকরী মাধ্যম

সমাজের অভ্যন্তরে উত্থাপিত বিভিন্ন ইস্যু কার্যকরভাবে মোকাবিলার প্রশ্নেই মূলত কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বের উদ্ভব অপরিহার্য হয়ে উঠে। আর এভাবেই রাজনীতির সূত্রপাত ঘটে। তাই সমাজবদ্ধ মানুষের অরাজনৈতিক নানাবিধ কার্যকলাপ, চিন্তাচেতনা, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতি বিষয়ের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া যার ফলশ্রুতিতে রাজনীতি ও নানারকম রাজনৈতিক নীতি-কৌশল আবিষ্কার ও তার প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে উঠে। তাই আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতিকে অগোছালো/জগাখিচুড়ি গোছের মনে হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে রাজনীতির আলোচনাকে সম্পূর্ণতাদানের এক কার্যকরী মাধ্যম।

সংসদীয় সরকারের বৈশিষ্ট্য | মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের বৈশিষ্ট্য

১০. অরাজনৈতিক বিষয়াবলির বিজ্ঞান

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান রাজনীতি সংশ্লিষ্ট অরাজনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা করে। যেমন- কীভাবে মানুষ তাদের রাজনৈতিক জীবন চর্চা করে।

১১. সমাজের পটভূমিতে রাজনীতির অধ্যয়ন

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান সামাজিক পটভূমিতে রাজনীতির অধ্যয়ন করে। এ প্রেক্ষিতে বিজ্ঞানটি রাজনীতিকে বৃহত্তর সমাজের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয় হিসেবে ধরে নিয়ে রাজনৈতিক। চলকগুলোকে মূল্যবোধ নিরপেক্ষভাবে বর্ণনা করে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের আলোচনার ক্ষেত্র রাজনৈতিক হলেও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণরূপে সামাজিক।

১২. ঐতিহাসিক তথ্য নির্ভর

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান ঐতিহাসিক তথ্য নির্ভর বিজ্ঞান। ঐতিহাসিক তথ্যর ভিত্তিতে এটি আধুনিক রাষ্ট্রসমূহের সমাজ-রাজনৈতিক রূপরেখা তথা কে শাসন করে? সমাজের শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গ, ইত্যাদি বৈষম্যের কারণে রাজনৈতিক রূপরেখা কীভাবে নির্ধারিত হয় তা পর্যালোচনা করে।

১৩. তুলনামূলক বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান রাজনৈতিক বিষয়াবলির তুলনামূলক বিশ্লেষণ। এতে বিভিন্ন সরকারের ধরনের উপর ইতিহাসের আলোকে তুলনামূলক আলোচনা করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় সংগঠনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংগঠন নিয়েও আলোচনা করা হয়, যাতে বিভিন্ন সমাজের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝা যায়।

১৪. সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান হলো রাজনীতির সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, কেননা এ রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান সমাজ বা সমাজ জীবনকে মুখ্য বিষয় হিসেবে ধরে নিয়ে রাষ্ট্রকে বৃহত্তর সমাজব্যবস্থার অঙ্গ হিসেবে ধরে নেওয়া হয় এবং রাজনৈতিক বিষয়াবলিকে সমাজতাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।

১৫. রাজনৈতিক পরিবর্তনের গতিধারা বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান সামাজিক উন্নয়নের সাথে রাজনৈতিক উন্নয়নের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নের সাথে রাজনৈতিক উন্নয়নের মৌলিক সূত্রসমূহ আবিষ্কার করতেও বিশেষ আগ্রহী। তা ছাড়া সমাজের অভ্যন্তরে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন কখনো মন্থর গতিতে হয় আবার কখনো অতি দ্রুত হয়। আর এ রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত কারণ ও পটভূমি বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান-পাশাপাশি বর্তমান এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে গণতন্ত্রের স্বরূপ, আর্থসামাজিক বাধাসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের দিক নির্দেশনাও এটি দিয়ে থাকে।

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান সামাজিক বিজ্ঞানের গোত্রভুক্ত এবং গতিশীল ও বাড়ন্ত একটি বিজ্ঞান। তাই এটি এখনও বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে। তাই এর গতিশীলতার দরুন এর প্রকৃতিকেও সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবুও এর বিভিন্ন সংজ্ঞাসমূহ বিশ্লেষণের দ্বারা এর উপরোক্ত প্রকৃতিসমূহ আমাদের সামনে ফুটে উঠেছে।

আশা করি, উপরের আলোচনা থেকে আপনারা রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন।

Related Posts