Home » পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা এসএসসি ও এইচএসসি
পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা

পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা এসএসসি ও এইচএসসি

by Susmi
1 comment

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তা তোমরা হয়তো জানো না। একটি দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকতে হয়, এটা হয়তো তোমরা জানো। মানুষসহ প্রতিটা প্রাণীর প্রতি মুহূর্ত বাঁচার জন্য অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। আর এই অক্সিজেনের প্রধান যোগানদাতাই হলো গাছ তথা বন। তাই পর্যাপ্ত গাছপালা ছাড়া মনুষ্য বসতিসহ একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। আজকের এই লেখায় পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সে সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরবো। এতে করে তোমাদের পরীক্ষার জন্যও পড়া হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সম্পর্কেও জানতে পারবে।

পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

ভূমিকা

বন প্রকৃতি মানুষের নিকটতম প্রতিবেশী। বনভূমিই পৃথিবীর প্রথম আগন্তুক। মানুষের আগমনের পূর্বেই সে এসে মানুষের ক্ষুধা মিটাবার খাদ্য এবং মাথা গুঁজবার শীতল ছায়া সৃষ্টি করে প্রতীক্ষা করছিল মানুষের আবির্ভাবের। তারপর মানুষ এলো এবং সৃষ্টির সেই প্রথম প্রভাতে মানুষ ভূমিষ্ঠ হয়েছিল স্নিখ শ্যামল অরণ্যের কোলেই। অরণ্য তার অবারিত শ্যামল ছায়া বিস্তার করে তাকে সূর্যের প্রখর দহনজ্বালা থেকে রক্ষা করেছিল। তার ক্ষুধার্ত মুখে অরণ্যই দিয়েছিল খাদ্য, প্রকৃতির নানা বিরুদ্ধ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে দিয়েছিল নিরাপদ আশ্রয়। গভীর অরণ্যের বুকে মানুষ গড়ে তুলেছে চঞ্চল জনপদ। জীবন স্পন্দনে অপূর্ব কোলাহল মুখর সে জনপদ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বিস্তৃত হয়েছে। মাঠে মাঠে ফসলের দোলা, কর্মের সমারোহ, আনন্দের জয়ধ্বনি জেগেছে। কৃষি সভ্যতার বুনিয়াদ মজবুত হয়েছে। প্রয়োজন বেড়েছে মানুষের। বনের গাছ কেটে মানুষ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তৈরি করেছে, ঘরের খুঁটি দিয়েছে। জীবিতকালে গাছ ফুলের সুবাস দেয়, ফল দেয়, অক্সিজেন দেয়, মরণের পরেও সে নানানভাবে মানুষের উপকার করে যায়। পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন এর মতো এমন উপকারী আর কিছু নেই।

বনায়নের উদ্দেশ্য

মানুষ আজ অরণ্য বিনাশের মাধ্যমে পৃথিবীতে ডেকে আনছে মরুভূমি। অরণ্যই মরুভূমিকে প্রতিরোধ করতে পারে, অরণ্যই মরুভূমিকে শ্যামল স্নিগ্ধ স্নেহময়ী জননীর মূর্তি দান করতে পারে। বনায়নের মাধ্যমে সম্ভব হয় পরিবেশ সংরক্ষণ ও মরুভূমির বশীকরণ। বনায়নের উদ্দেশ্যই হলো তাই। অরণ্যের তরুশিশুদলকে মানবসমাজের সান্নিধ্যে আহবান করাই তার মূল উদ্দেশ্য। জনভূমি ও বনভূমির মধ্যে একদিন ব্যবধান ছিল না। কিন্তু পাশ্চাত্য সভ্যতার নগরকেন্দ্রিকতা অরণ্যকে ধ্বংস করে তার ওপর ইট কাঠ পাথরের কৃত্রিম শোভা স্থাপন করে প্রকৃতপক্ষে মানবজাতির কবরভূমি রচনা করেছে। বনায়নের উদ্দেশ্য এই কবরভূমি থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করে একটা সুন্দর পরিবেশ উপহার দেওয়া। তাই তো পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে কবি বলেছেন-

“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,

লও যত লৌহ, লোষ্ট্র, কাঠ ও প্রস্তর।

হে নব-সভ্যতা, হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,

দাও ফিরে তপোবন, পুণ্যচ্ছায়ারাশি,

গ্লানিহীন অতীতের দিনগুলো।”

বনভূমি ও মানবজীবন

মানবজীবন ও অরণ্যজীবন প্রাণের এই দুই মহান প্রকাশের মধ্যে বাজে একটিমাত্র ছন্দ। ঋতুচক্রের আবর্তনের পথে উভয়ের একই স্পর্শকাতরতা। বসন্তের দক্ষিণ বাতাসে মানুষ তার হৃদয়ের আনন্দানুভূতিকে চিত্রে, সংগীতে কিংবা কবিতায় প্রকাশ করে। আর অরণ্য তার বাসন্তী বেদনাকে প্রকাশ করে অশোক, পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম প্রগলভতায়। উভয়ের আদান প্রদানের সম্পর্কও অতি নিবিড়। এক বিপুল ভ্রান্তিবিলাসের জন্যে মানুষ এতদিন তার পরম বন্ধুকে চরম শত্রু মনে করে নির্বোধ ঘাতকের মতো ধ্বংসের পৈশাচিক লীলায় মেতে উঠেছিল। মানুষের এই কৃতঘ্নতার তুলনা কোথায়? কাজেই, আজ আর বনভূমি ধ্বংস নয়, বনভূমি সৃজনই প্রয়োজন।

পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা এর পাশাপাশি অন্যান্য রচনা

বৃক্ষরোপণ অভিযান রচনা (৯০০ শব্দ)

পরিবেশ দূষণ রচনা Class 7, 8, 5, SSC, HSC

আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ও বাংলাদেশ রচনা SSC HSC

বাংলাদেশের বনভূমি

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি বনায়নের জন্যে অত্যন্ত সহায়ক। আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন আছে। যেমন- গাজীপুর জেলার অন্তর্গত ভাওয়ালের গজারি বন, টাঙ্গাইলের মধুপুরের বন, খুলনা বিভাগের অন্তর্গত সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমি, কুমিল্লার শালবন বিহার ইত্যাদি। এককালে এসব বনাঞ্চলে বড় বড় গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল। বর্তমানে বনভূমি প্রায় উজাড় হওয়ার পথে। এতে পরিবেশগত দিক থেকে বাংলাদেশ ভীষণ সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশ ও সামাজিক বনায়ন

পরিবেশ নিঃসন্দেহে মানবধাত্রীর মতো। প্রকৃতি ও মানবচরিত্রের মধ্যে বিরোধ নয়, উভয়ের মধ্যে রয়েছে গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক। এই সম্পর্ককে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বিশুদ্ধ পরিবেশ দরকার। তাই পরিবেশ সংরক্ষণের জন্যেও বাংলাদেশে বনায়নের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সামাজিকভাবে বনায়ন কর্মসূচি সফল করতে না পারলে মানুষের উপযোগী পরিবেশ সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

আমরা জানি, প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্যে বাংলাদেশের ২৫ শতাংশ বনভূমি আবশ্যক, কিন্তু এখানে বর্তমানে আছে মাত্র ১৬.৪৬ শতাংশ বনভূমি। আমাদের পরিবেশ ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে বনায়ন বৃদ্ধি করা উচিত। তা না হলে আমরা গ্রীণ হাউস ইফেক্ট এর করালগ্রাস থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারব না। বৈজ্ঞানিকদের সমীক্ষায় জানা গেছে যে, গ্রীণহাউসের প্রভাবে বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক কিলোমিটার বৃদ্ধি পেতে পারে, আর তাতে উপকূলীয় অঞ্চল প্রায় ২২,৮৮৯ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ পানির নিচে ডুবে যেতে পারে। তাছাড়া আমাদের প্রাণিজগতের বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় উপাদান হলো অক্সিজেন। অক্সিজেন আমরা সাধারণত পেয়ে থাকি গাছপালা বা বনভূমি থেকে। আমাদের দেশের মানুষের জন্যে যে পরিমাণ অক্সিজেনের প্রয়োজন, সে পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়ার মতো বনভূমি বাংলাদেশে নেই। তাই মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ সংরক্ষণ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাবার জন্যে আমাদের বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা খুবই দরকার।

সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি সফল করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করতে হবে। বনায়নের জন্যে যে শুধু বিশাল বনভূমিকেই বেছে নিতে হবে তা নয়, আমাদের বাড়ির আশেপাশে অনেক অনাবাদী জায়গা থাকে, পুকুরপাড়ে পড়ে থাকে অনেক জায়গা, এসব জায়গায় গাছপালা লাগিয়ে বনায়ন কর্মসূচি পালন করা যায়। তাছাড়া রাস্তার ধারে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে ও খেলার মাঠের ধারেও গাছ লাগানো যায়। এসমস্ত কর্মসূচি শুরু হলে সামাজিকভাবে মানুষ উৎসাহিত হবে এবং বনায়নে এগিয়ে আসবে।

বনায়নের উপকারিতা

বনায়নের উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। বনভূমি সূর্যের প্রখর কিরণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রকৃতির শোভাবর্ধন করে। প্রয়োজনীয় কাঠ সরবরাহ করে বনভূমি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের চাহিদা মিটিয়ে থাকে। এই বনভূমি উচ্ছন্নে গেলে দেশ অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই প্রত্যেক দেশের সরকারই বনভূমি রক্ষা করার জন্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বনভূমির অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গাছপালা বায়ুর অঙ্গার অম্লজ গ্যাস গ্রহণ করে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজের খাদ্য তৈরি করে ও বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্যাস বাতাসে ছেড়ে দেয়। এই অক্সিজেন আমাদের জীবনধারণের জন্যে একান্ত অপরিহার্য। গাছপালা না থাকলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেত এবং অক্সিজেনের অভাবে প্রাণী মারা যেত। একমাত্র গাছপালা বা বনায়নই আমাদের জীবনধারণের সুস্থ পরিবেশের নিশ্চয়তা দান করে। তাছাড়া গাছপালা শুধু ছায়া ও শোভাই বিস্তার করে না, ফুল, ফল দান করে এবং প্রয়োজনীয় কাঠ সরবরাহ করে আমাদের অনেক উপকার করে থাকে। গাছ আমাদের উপাদেয় খাদ্য ও অর্থকরী ফল সরবরাহ করে থাকে। তাই বনায়নের গুরুত্ব অপরিসীম।

উপসংহার

আজ আর বনভূমি ধংন নয়, বনভূমি সৃজনই প্রয়োজন। স্নিগ্ধ, শীতল ছায়া এবং প্রাণের উৎস অম্লজান থেকে আরম্ভ করে খাদ্য, বাসগৃহ, ঔষধপত্র পর্যন্ত সবই অরণ্যের অবদান। অরণ্য ছাড়া পৃথিবী পরিণত হতো মরুভূমিতে। অরণ্যই প্রাণের অগ্রদূত। বিজ্ঞান নির্ভর যান্ত্রিক সভ্যতার ক্রমবিস্তার এবং অরণ্য সংহারে প্রাকৃতিক আবহাওয়ার যে ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এখন বনায়নই তার একমাত্র প্রতিকার।

Related Posts

1 comment

হেমন্তকাল রচনা December 4, 2023 - 12:29 pm

[…] আরও পড়ুন:   পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা […]

Comments are closed.