Home » নির্বাণ বলতে কি বুঝ? নির্বাণ কত প্রকার ও কি কি? নির্বাণের বর্ণনা দাও।
নির্বাণ বলতে কি বুঝ

নির্বাণ বলতে কি বুঝ? নির্বাণ কত প্রকার ও কি কি? নির্বাণের বর্ণনা দাও।

by Susmi
0 comment

মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধ যে ধর্ম প্রচার করেছেন তার মূল লক্ষ্য হল নির্বাণ। এটি বিশ্বের দর্শন জগতের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ দর্শন। এটি মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। এই নির্বাণ সত্যের জন্যেই বুদ্ধ বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবরূপে পূজিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। এটি অব্যক্ত, অনির্বচনীয় ও আর্য ব্যক্তিদের জ্ঞানগম্য। ভব-যন্ত্রণার হাত থেকে চির-মুক্তিরই এক নাম নির্বাণ।  নির্বাণ সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের অতীত, ভাবাভাব বিনির্মুক্ত, পরম আনন্দময় ও অমৃতময় এক অবস্থা। এটি হলো সেই অবস্থা যেখানে জন্ম নেই, জরা নেই, ব্যাধি নেই, মৃত্যু নেই, শোক নেই, মনস্তাপ নেই, হতাশা নেই; এমন কি যেখানে পৃথিবী, জল, তেজ, বায়ু নেই। চন্দ্র-সূর্য গ্রহ নক্ষত্রের সংস্থান নেই, অথচ অন্ধকারও নেই। যেখানে সংসার স্রোতের গতি রুদ্ধ হয়েছে। নামরূপ অশেষরূপে নিরুদ্ধ হয়েছে, গ্রন্থি খুলে ‍গিয়েছে। এষণা ক্ষয় হয়েছে, বন্ধন ছিন্ন হয়েছে, সেই পরম অবস্থাকে নির্বাণ বলা হয়েছে।

নির্বাণ শব্দের অর্থ কি?

নির্বাণ শব্দের অর্থ নিভে যাওয়া। নির্বাণ শব্দটি ” নি” উপসর্গের সাথে “বাণ” শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে “নি” দ্বারা নিঃশেষ এবং “বাণ” দ্বারা তৃষ্ণাকে বুঝানো হয়েছে। যেখানে বন্ধন বা তৃষ্ণা নেই তাহাই নির্বাণ। অর্থাৎ যে ধর্ম প্রত্যক্ষ করলে স্বয়ং উপলব্ধি করলে, জন্ম-জন্মান্তর ধরে কৃত তৃষ্ণা বন্ধন ছিন্ন করতে সমর্থ হয়, তারই নাম নির্বাণ। বিশিষ্ট বৌদ্ধ পন্ডিত, দার্শনিক ও শাস্ত্রকারগণ বিভিন্নভাবে নির্বাণের সংজ্ঞা দিয়েছেন। 

“বুদ্ধচরিত কাব্য” রচয়িতা কবি অশ্বঘোষ বলেছেন, নির্বাণ পুনর্জন্মের নিবর্তক। অর্থাৎ জন্মের সংস্কার সমূহ ক্ষয় করতে না পারলে জন্মান্তর রোধ হয়না। সুতরাং সংস্কার সমূহের পূর্ণ উচ্ছেদ সাধনই হলো নির্বান।

আচার্য শান্তিদেবের মতে, সর্বত্যাগই নির্বাণ। অর্থাৎ সুখ-দুঃখ, পঞ্চস্কন্ধ এবং অহংবোধ ত্যাগই হলো নির্বাণ।

নির্বাণের প্রকারভেদ

নির্বাণ দুই প্রকার। যথা-

১.সোপাদিশেষ, ও

২.অনুপাদিশেষ।

সোপাদিশেষ নির্বাণ: রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান এই পাঁচটি উপাদানকে বৌদ্ধ পরিভাষায় বলা হয় পঞ্চস্কন্ধ। পঞ্চস্কন্ধ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় দুঃখ সমূহের বিনাশ করে কোন সাধক পুরুষ নির্বাণের জ্ঞান উপলব্ধি করলে তাকে বলে সোপাদিশেষ নির্বাণ। ভগবান বুদ্ধ নৈরজ্ঞনা নদীর তীরে বোধিবৃক্ষমূলে বুদ্ধত্ব লাভের সঙ্গে সঙ্গে সোপাদিশেষ নির্বাণপ্রাপ্ত হন।

অনুপাদিশেষ নির্বাণ: নির্বাণদর্শী মুক্ত পুরুষ পঞ্চস্কন্ধের বিনাশ করে যখন পরিনির্বাণে নিবৃত্ত হন তখন তাকে বলে অনুপাদিশেষ নির্বাণ। গৌতম বুদ্ধ সম্বোধি লাভের ৪৫ বৎসর পরে কুশীনগরে যমক শালবৃক্ষের তলায় অনুপাদিশেষ নির্বাণ লাভ করেন।

আরও পড়ুন:   অভিধর্ম শব্দের অর্থ কি? অভিধর্মের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোচনা কর

নির্বাণের স্বরূপ

নির্বাণের স্বরূপ বুঝতে হলে বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডের সব রকম জীব ও জড় বস্তু সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা দরকার। কেননা প্রত্যক জীব ও জড় বস্তুতে আছে ভিন্ন ভিন্ন গুণের সমাবেশ। আবার এই গুণাবলি স্থির বা শাশ্বত নয়। নিয়ত পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনশীলতা কখনও সুখকর নয়, বরং দুঃখময়। মানুষের দেহ ও মন কোন কিছু্ই চিরস্থায়ী নয়। সেজন্য আত্মার চিরস্থায়ী অস্তিত্ব স্বীকার করা যায় না। এজন্য বুদ্ধ বলেছেন, সংসার অনিত্য, দুঃখময় এবং অনাত্মা।

নির্বাণের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে “মিলিন্দ প্রশ্ন” বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাণ অনির্বচনীয় তুলনাবিহীন। এটি লোকোত্তরের বিষয়। এটা কারণ-সম্ভূত নয়। যার উৎপত্তি ও বিনাশ আছে, তা লোকীয়। কিন্তু নির্বাণের উৎপত্তি নেই, বিনাশও নেই। এটা ভাবাভাব বিনির্মুক্ত এক অনির্বচনীয় অবস্থা বিশেষ, যা বর্ণনা করা যায় না, কারণ নির্বাণ অপরিণামশীল ও অবিনশ্বর। সদাকালিক বা কালাতীত বলে এটা ধ্রুব। সংসার এর বিপরীত। নির্বাণ ধ্রুব বলে শুভ। ধ্রুব ও শুভ বস্তু একান্তই সুখময়। তাই বুদ্ধ বলেছেন- “নিব্বাণং পরমং সুখং” অর্থাৎ নির্বান পরম সুখের ও পরম শান্তির অবস্থা।

মিলিন্দ প্রশ্নে বলা হয়েছে-নির্বাণ শান্ত, প্রণীত ও সুখদায়ক। দুঃখের উপশমতা এর স্বভাব। অচ্যুতি এর রস বা কৃত্য। নির্বাণপ্রাপ্ত ব্যক্তির পুনর্জন্ম রুদ্ধ। রাগ-দ্বেষ-মোহ শূন্য এবং সর্ববিধ সংস্কার শূন্য বলে নির্বাণকে শূন্য বলা হয়। এটা রাগাদি নিমিত্ত রহিত বলে এটাকে অনিমিত্ত বলা হয়। অন্ত রহিত বলে নির্বাণ অনন্ত। যা কারণ সম্ভূত তাহাই সংস্কৃত। কিন্তু প্রত্যয়াদি দ্বারা কৃত নহে বলে নির্বাণ অসংস্কৃত। এটা অপেক্ষা উচ্চতর ও উৎকৃষ্টতর কিছু নেই।

নির্বাণ কোথায়?

দিব্যলোক, ব্রক্ষ্মলোক, চন্দ্রমণ্ডল, সূর্যমণ্ডল প্রভৃতি জড় পদার্থ যেমন কক্ষচ্যুত না হয়ে অনন্ত আকাশে স্ব স্ব স্থানে অবস্থান করছে, তদ্রুপ নির্বাণ কোন স্থানের দ্বারা পরিচ্ছিন্ন নহে। আবার চেতনের পরিণাম লক্ষণ ও এখানে স্থান পায়নি। পূর্ব পশ্চিম দিশা দ্বারা এর স্থিতি নির্ণয় করা চলে না। স্থান ও কালের অপরিচ্ছিন্ন বলে এটা অবিদ্যমান অবস্থাও নহে।

বৈজ্ঞানিকেরা বলেন তেজধাতুর গতি নিরন্তর আছে। অথচ সাধারণ্যে এটা দেখতে পায় না। যার প্রয়োজন আছে, সে আলো হতে সাহায্য নিয়ে স্বকার্য সাধন করছে। তদ্রূপ নির্বাণ সাধারণ্যের অনুপলভ্য হলেও অথবা আধার-আধেয় সম্বন্ধ দ্বারা নির্দেশ করা না গেলেও আরব্ধবীর্য যোগী এর সাক্ষাৎ করতে পারেন। কাজেই এর অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না।

স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী, অরহত্ব ফলের আলম্বন হচ্ছে নির্বাণ। এটি বাক্য ও মনের অগোচর হলেও অবিদ্যমান নহে। আর এটা যত সূক্ষ্ম হোক জড় পদার্থ নহে অথবা যতই পরিশুদ্ধ হোক, চেতন পদার্থ নহে। এটা জড়-চেতন উভয় অবস্থা-বিনির্মুক্ত। এটি নিত্যস্থায়ী, কিন্তু অবিদ্যান্ধ তা দেখতে পায় না, অবিদ্যা নিরাকরণ হলে ঐ সমুজ্জল নির্বান দৃষ্টিগোচর হয়।

নির্বাণের সাক্ষাৎ 

“নির্বাণ অধিগত করার উপায় সম্পর্কে বুদ্ধ বলেছেন- 

সীলে পতিট্ঠায় নরোসপঞঞো, চিত্তং পঞ্ঞঞ্চ ভাবয়ং,

আতাপী নিপকো ভিক্খু সো ইমং বিজটয়ে জটন্তি।”

অর্থাৎ,  দৃঢ়বীর্য প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি শীলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে চিত্ত ও প্রজ্ঞা ভাবনা করলে এই জটারূপী সংসার-বন্ধন হতে মুক্ত হতে সমর্থ হন। তখন লোভ-দ্বেষ-মোহ-মদ-মাৎসর্য প্রভৃতি রিপুচয় চিত্ত হতে চিরতরে বিদূরিত হয়, চিত্ত হয় প্রসন্ন ও প্রভাস্বর। এতাদৃশ চিত্তেই প্রজ্ঞার জ্যোতি বিকীর্ণ হয়। তারই শুভ্র আলোকে নির্বাণ উপলব্ধি হয়। এ তিনটি পরস্পর আপেক্ষিক।

শীলদ্বারা দুশ্চরিত্র-সংক্লেশ বিশোধন, সমাধি দ্বারা তৃষ্ণা-সংক্লেশ বিশোধন এবং প্রজ্ঞা দ্বারা দৃষ্টি সংক্লেশ বিশোধন হয়। চারিত্রিক পবিত্রতা অর্জিত না হলে চিত্তের উৎকর্ষ লাভের সাধনা পূর্ণ হয় না। সাধনার অভাবে প্রজ্ঞার উৎপত্তি হয় না। প্রজ্ঞাহীন অন্ধকারাচ্ছন্ন মন নির্বাণের সন্ধান পায়না।

অতএব, নির্বাণের উপলব্ধির জন্যে চারিত্রিক পবিত্রতা, চিত্তের নহে। নির্বাণ উপলব্ধিরও স্তরভেদ আছে- স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী ও অর্হৎ। শীলদ্বারা স্রোতাপন্ন ও সকৃদাগামী ভাবের কারণ প্রকাশিত হয়ে থাকে। সমাধি দ্বারা অনাগামী ভাবের এবং প্রজ্ঞা দ্বারা অর্হত্ব ভাবের প্রকাশ হয়।

স্রোতাপত্তি নির্বাণ উপলব্ধির প্রথম স্তর। এ স্তরে সৎকায় দৃষ্টি, সংশয় ও শীলব্রত পরামর্শ চিরতরে বিদূরিত হয়। সকৃদাগামীর কাম-ক্রোধ শিথিল হয়ে পড়ে। অনাগামীর কাম-ক্রোধ সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে যায়।  অর্হত্বে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গেই অবশিষ্ট সংযোজন- অহংভাব, ভবাসক্তি ও অবিদ্যা নিঃশেষে ধ্বংস হয়ে যায়। তখনই তিনি সর্ববন্ধহীন, পরম শান্তিপ্রদ ও সুখকর নির্বাণ প্রত্যক্ষ করেন।

উপসংহার

দেবতা ও মানবের যে কোনরূপ সাধনায় উত্তম কাম্য নির্বাণ ছাড়া আর কিছু নেই। এজন্য ধ্যানী বিজ্ঞ পুরুষরা নিরলস সাধনায় রত হন। এই নিরলস সাধনা তাঁকে নির্বাণের পথে নিয়ে যায়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হিসেবে নির্বাণই আমাদের পরম কাম্য। তাই গৌতম বুদ্ধ নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে নির্বাণ লাভের প্রচেষ্টাই আমার, তোমার এবং সকলের নিত্যকর্ম হওয়া উচিত।

Related Posts