ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনজনিত কারণে যে জলবায়ুর উদ্ভব হয় তাই মৌসুমী জলবায়ু। মৌসুমী জলবায়ু নিয়ন্ত্রণকারী প্রধান উপাদান হলো মৌসুমী বায়ু।
মৌসুমী জলবায়ু
আরবি শব্দ ‘মওসুম’ হতে মৌসুমি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে, যার অর্থ হলো ঋতু। সুতরাং ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বায়ুর গতি পরিবর্তিত হয়ে যে জলবায়ুর সৃষ্টি হয় তাকে মৌসুমি বায়ু বলে। আর যে অঞ্চলের ওপর দিয়ে এ জলবায়ু প্রবাহিত হয় তাকে মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চল বলে। ক্রান্তীয় অঞ্চলে এর প্রভাব বেশি থাকায় একে ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ুও বলা হয়।
নিরক্ষীয় জলবায়ু কাকে বলে? নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সমূহ |
মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য
নিম্নে মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচিত হলো-
১ . অবস্থান
মৌসুমি অঞ্চলের অবস্থান উত্তর গোলার্ধে ১৫°- ৩০° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে মহাদেশগুলোর পূর্বাংশ এবং কর্কটক্রান্তি ও মকর ক্রান্তীয় মধ্যবর্তী অঞ্চলসমূহে মৌসুমি জলবায়ু অবস্থিত।
২. বিশ্বব্যাপী বণ্টন
মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এলাকাসমূহ নিম্নে ছকের মাধ্যমে দেখানো হলো-
মহাদেশসমূহ | দেশ বা অঞ্চলসমূহ |
এশিয়া | বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, মধ্য ও দক্ষিণ চীন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ জাপান, পশ্চিম ফিলিপাইন, ব্রুনাই, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং তাইওয়ান। |
আফ্রিকা | আফ্রিকার পূর্ব উপকূলবর্তী দেশসমূহ যথা- মোজাম্বিক, সোয়াজিল্যান্ড, মালাগাছি ও লেসেথো। |
উত্তর ও মধ্য আমেরিকা | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল, মেক্সিকো, ক্যারিবিয়ান ও মেক্সিকো উপসাগরের দেশ, যথা- কিউবা, হাইতি, জ্যামাইকা, বাহামা প্রভৃতি এবং মধ্য আমেরিকার কোস্টারিকা, এলসালভাদর, পানাম, নিকারাগুয়া ও গুয়েতেমালা। |
দক্ষিণ আমেরিকা | উরুগুয়ের উত্তর-পূর্বাংশ, ব্রাজিলের পূর্বাংশ, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলার উত্তরাংশ। |
অস্ট্রেলিয়া | অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল। যথা- কুইন্সল্যান্ড, কার্পেন্টারিয়া উপসাগরের পশ্চিমাঞ্চল ও নিউসাউথ ওয়েলসের উত্তর-পূর্বাংশ। |
৩. জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য
এ অঞ্চলের লর জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য হলো ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বায়ুর অঞ্চলের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলো- দিক পরিবর্তন করা। নিচে এ
ক. উৎপত্তি: শীত ও গ্রীষ্ম ঋতুতে জলভাগ ও স্থলভাগের উচ্চতার তারতম্যের ফলেই মৌসুমি বায়ুর উৎপত্তি হয়।
খ. বায়ুর গতি: মৌসুমি জলবায়ুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বায়ুর গতিও পরিবর্তিত হয়। মৌসুমি বায়ু গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম এবং শীতকালে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়।
গ. উষ্ণতা: মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে গড় উচ্চতা ২১°-৩২° সে. এবং শীতকালে গড় উফতা ১০°-২১° সে.।
ঘ. বৃষ্টিপাত: এ জলবায়ুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গ্রীষ্মকালে অধিক বৃষ্টিপাত এবং শীতকালে খুব কম বৃষ্টিপাত হয়। গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১২৭-২০৩ সেমি।
৩. ঋতু পরিবর্তন
মৌসুমি জলবায়ুতে গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত এ তিনটি ঋতুর প্রভাব দেখা যায়।
৪. ভূ-প্রকৃতি
মৌসুমি অঞ্চল প্রাকৃতিকভাবে বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। ভূপ্রকৃতি অনুসারে মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি, মালভূমি এবং সুউচ্চ পার্বত্যাঞ্চল।
৫. মৃত্তিকা
এ অঞ্চলের অধিকাংশ মৃত্তিকা নদীবাহিত উর্বর পলিমাটি দ্বারা গঠিত, যা কৃষির জন্য যথেষ্ট উপযোগী।
৬. উদ্ভিদ
ঋতুভেদে জলবায়ুর তারতম্যহেতু এ অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ জন্মায়। মেহগনি, শাল, সেগুন, আবলুস, সুন্দরী, অর্জুন ইত্যাদি এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য বৃক্ষ।
৭ . কৃষি ও কৃষিজাত দ্রব্য
ভূমির উর্বরতাহেতু মৌসুমি অঞ্চল কৃষিতে উন্নত। এ অঞ্চলের প্রধান ফসল ধান। এছাড়া গম, বাজরা, ইক্ষু, পাট, তামাক, চা, কফি, তেলবীজ, ডাল, রেশম ও কার্পাস প্রচুর পরিমাণে জন্মে।
৮. জীবজম্মু ও প্রাণিজ সম্পদ
মৌসুমি অঞ্চলের গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরু, মহিষ, মেষ, ছাগল, অশ্ব প্রভৃতি প্রধান। এ অঞ্চলের গভীর অরণ্যে বাঘ, ভাল্লুক, চিতাবাঘ প্রভৃতি মাংসসাশী এবং হরিণ, গণ্ডার, হস্তী প্রভৃতি তৃণভোজী প্রাণী বাস করে।
জলবায়ুর নিয়ামক গুলো কি কি? |
৯. খনিজ সম্পদ
মৌসুমি অঞ্চল নানা প্রকার খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এদের মধ্যে কয়লা, লৌহ, চুনাপাথর, খনিজ তেল, ম্যাঙ্গানিজ, অভ্র ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রধান।
১০. পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
মৌসুমি অঞ্চলে পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটামুটি উন্নত। এ অঞ্চলের অধিকাংশ দেশে অভ্যন্তরীণ পরিবহণে সারা বছরই নদীপথের ভূমিকা সর্বাধিক।
১১. শিল্প ও বাণিজ্য
মৌসুমি অঞ্চল কৃষিতে উন্নত বিধায় এ অঞ্চলে কৃষিজাত দ্রব্যসংক্রান্ত অনেক শিল্প গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য শিল্পগুলো হলো পাট, বস্ত্র, কাগজ, চা, রবার, চর্ম, লৌহ, ইস্পাত প্রভৃতি।
১২. অধিবাসী ও তাদের কার্যাবলি
এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান উপজীবিকা কৃষি। মৎস্য শিকার, খনিজ সম্পদ আহরণ, বন হতে কাষ্ঠ সংগ্রহ প্রভৃতি দ্বারাও অসংখ্য লোক জীবিকা নির্বাহ করে।
১৩. নদনদী
বৃষ্টিপাত অধিক হওয়ায় মৌসুমি অঞ্চলের পাহাড়িয়া এলাকার অসংখ্য নদনদী সমভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
১৪. অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
মৌসুমী অঞ্চল কৃষি সম্পদে সমৃদ্ধ বলে এ অঞ্চলে কৃষির উন্নতির সাথে সাথে কৃষি নির্ভরশীল শিল্পসমূহ অতি সহজে গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলে প্রচুর খনিজ সম্পদ তথা কয়লা, লৌহ, গ্যাস, পেট্রোলিয়াম প্রভৃতি পাওয়া যায়।
উপসংহার
মৌসুমী জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য অন্যান্য জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এ জলবায়ু ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়ে থাকে।