জ্ঞানতত্ত্ব ও ন্যায় জ্ঞানতত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা।
ভূমিকা
ন্যায় দর্শন আস্তিক বস্তুবাদী দর্শন। একে আস্তিক বলা হয়, যেহেতু এই দর্শন বেদকে প্রামাণ্য বলে গ্রহণ করে এবং এই দর্শন বস্তুবাদী সেহেতু এই দর্শনে জ্ঞান নিরপেক্ষ বস্তুর স্বাধীন সত্ত্বা আছে। ন্যায় দর্শন বেদকে প্রামাণ্য বলে স্বীকার করলেও স্বাধীন চিন্তা ও বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত। মহর্ষি গৌতম ন্যায় দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি অক্ষপাদ নামেও পরিচিত। ন্যায় দর্শনের প্রত্যক্ষ হল অন্যতম প্রমাণ বা যথার্থ জ্ঞান লাভের প্রণালী । তাই ন্যায় দর্শনে প্রত্যক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম।
জ্ঞানতত্ত্ব
গ্রিক “episteme” ও “logos” শব্দদ্বয়ের সংসক্তিতেই Epistemology শব্দটির উদ্ভব আর এই শব্দেরই বাংলা রূপ জ্ঞানতত্ত্ব। জ্ঞানতত্ত্ব হচ্ছে জ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি সংশ্লিষ্ট দর্শনের শাখা। জ্ঞান কি,কিভাবে এটি অর্জিত হতে পারে, যেকোনো বিষয় বা সত্তা সম্পর্কে কী মাত্রায় জ্ঞান অর্জন করা যায়ে এসব নিয়েই আলোচনাই হচ্ছে জ্ঞানতত্ত্ব ।
ন্যায় জ্ঞানতত্ত্ব
ন্যায় মতে জ্ঞান গুণপদার্থ। এই গুণ হলো আত্মার গুণ। জ্ঞান স্বনাম প্রসিদ্ধ গুণ, বুদ্ধি, চেতনা ইত্যাদি শব্দ দ্বারা এর পরিচয় প্রদান করা হয়। যা সকল প্রকার ব্যবহারের অসাধারন হেতু তাই জ্ঞান। ন্যায় দর্শনে জ্ঞান দুই প্রকার। যথা- ১.যথার্থ জ্ঞান, ২.অযথার্থ জ্ঞান। যথার্থ জ্ঞানকে প্রমা এবং অযথার্থ জ্ঞানকে অপ্রমা বলা হয়। যে জ্ঞানে আমাদের কোনো রকম সন্দেহ বা সংশয় নেই এবং যে জ্ঞান বিষয়ের অনুরূপ সেই জ্ঞানই হলো প্রমা বা যথার্থ জ্ঞান। ন্যায় দর্শনে প্রমা চার প্রকার। যথা– ১. প্রত্যক্ষ, ২. অনুমান, ৩. উপমান, ৪. শব্দ।
১.প্রত্যক্ষ
প্রত্যক্ষ হল বিষয় এবং ইন্দ্রিয়ের। সন্নিস্বজনিত বিষয়ে নিশ্চিত এবং যথার্থ জ্ঞান। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে মনের এবং বিষয়ের যে সংযোগ ঘটে তাতে জ্ঞান উৎপন্ন হয়। প্রত্যক্ষ্য মন, আত্মা এবং বিষয়ের মধ্যস্থতা করে।
আরও পড়ুন: ন্যায় দর্শন কি? ন্যায় দর্শনে কার্যকারণ তত্ত্ব
প্রত্যক্ষের শ্রেনীবিভাগ
প্রত্যক্ষ দুই প্রকার। যথা- লৌকিক এবং অলৌকিক । লৌকিক আবার দুই প্রকার। বাহ্য এবং আন্তর। অলৌকিক ৩ প্রকার। যথা– সামান্য লক্ষণ, জ্ঞানলক্ষণ, যোগজ।
প্রত্যক্ষকে আবার তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ১. নির্বিকল্প প্রত্যক্ষ, ২. সবিকল্প প্রত্যক্ষ, ৩. প্রত্যভিক্ষা।
ক.লৌকিক প্রত্যক্ষ: চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের সংযোগের ফলে যে প্রত্যক্ষ হয় তাই লৌকিক প্রত্যক্ষ। লৌকিক প্রত্যক্ষ দুই প্রকার। যথা-
১.বাহ্য প্রত্যক্ষ: চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক এ পাঁচটি বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ের সাথে যখন বিষয়ের সংযোগ ঘটে তাকে বাহ্যিক প্রত্যক্ষ বলে।
২.আন্তর প্রত্যক্ষ: মন বা অন্তরিন্দ্রিয়ের সঙ্গে চিন্তা, অনুভূতি প্রভৃতি মানসিক প্রক্রিয়ার সংযোগের ফলে যে প্রত্যক্ষ হয় তাকে আন্তর প্রাত্যক্ষ বলে।
খ.অলৌকিক প্রত্যক্ষ: যে প্রত্যক্ষে বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের স্বাভাবিক সংযোগ হয় না, অথচ কোন সাধারণ উপায়ে প্রত্যক্ষ হয়, তাকে অলৌকিক প্রত্যক্ষ বলে। অলৌকিক প্রত্যক্ষ তিন প্রকার। যথা-
১.সামান্যলক্ষণ প্রত্যক্ষ: যে প্রত্যক্ষে কোন বস্তু বা ব্যক্তিতে তার জাতির সামান্য ধর্মের প্রত্যক্ষের ভিত্তিতে সমগ্র জাতিকে প্রত্যক্ষ করা হয়, তাকে সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয়।
২.জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ: কোন একটি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা তার নিজের বিষয়ীভূত গুণ ছাড়াও যদি অন্য ইন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত গুণ প্রত্যক্ষ করা হয়, তখন তাকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলা হয় ।
৩.যোগজ প্রত্যক্ষ: যোগ সাধনালব্ধ অলৌকিক শক্তির সাহায্যে যোগীদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, দূরবর্তী ও অতি সূক্ষ্ম বস্তুকে সমান ভাবে প্রত্যক্ষ করাই যোগজ প্রত্যক্ষ।
২.অনুমান
অনুমান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল জ্ঞানের পশ্চাৎগামী জ্ঞান, অনু শব্দের অর্থ পশ্চাৎ আর মান শব্দের অর্থ হল জ্ঞান। কোন জ্ঞাত বিষয়ের উপর নির্ভর করে এবং তার দ্বারা সমর্থিত হয়ে যদি কোন অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা হয়, তবে তাকে অনুমান বলে।
অনুমানের শ্রেণীবিভাগ
অনুমান যে উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে তার ভিত্তিতে অনুমান ২ প্রকার। যথা- স্বার্থানুমান, পরার্থানুমান।
ক.স্বার্থানুমান: অনুমানকারীর নিজের জ্ঞান লাভের জন্য যে অনুমান করা হয় তাই স্বার্থানুমান।
খ.পরার্থানুমান: অপরের কাছে কিছু প্রমান করার জন্য যে অনুমান করা হয় তাই পরার্থানুমান।
অপর নীতি অনুসারে অনুমান তিন প্রকার। যথা- পূর্ববৎ, শেষবৎ ও সামান্যতোদৃষ্ট।
ক.পূর্ববৎ: যে অনুমানে কারণকে প্রত্যক্ষ করে অপ্রত্যক্ষ কার্যকে অনুমান করা হয় তাকে পূর্ববৎ অনুমান বলা হয়।
খ.শেষবৎ: যে অনুমানে কার্যকে প্রত্যক্ষ করে অপ্রত্যক্ষ কারণকে অনুমান করা হয় তাকে শেষবৎ অনুমান বলা হয়।
গ.সামান্যতোদৃষ্ট: কার্যকারণ নীতিকে অবলম্বন না করে কেবল পূর্ব অভিজ্ঞতা ও সাদৃশ্যের উপর নির্ভর করে যে অনুমান করা হয়, তাকে সামান্যতোদৃষ্ট অনুমান বলা হয়।
অপর আর একটি নীতি অনুসারে নৈয়ায়িকগণ অনুমানকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যথা- কেবলাম্বয়ী, কেবল-ব্যতিরেকী ও অন্বয়-ব্যতিরেকী।
ক.কেবলাম্বয়ী: যে অনুমানে ব্যাপ্তি সম্পর্ক কেবলমাত্র অন্বয়ী দৃষ্টান্তের উপর নির্ভরশীল তাকে কেবলাম্বায়ী বলা হয়।
খ.কেবল–ব্যতিরেকী: যে অনুমানে ব্যাপ্তি সম্পর্ক কেবলমাত্র ব্যতিরেকী দৃষ্টান্তে উপর নির্ভর শীল তাকে কেবল – ব্যতিরেকী বলা হয়।
গ.অন্বয় – ব্যতিরেকী: যে অনুমানে ব্যাক্তি সম্পর্ক অন্বয় ও ব্যতিরেকী এই উভয় প্রকার দৃষ্টান্তের উপর নির্ভরশীল তাকে অন্বয়–ব্যতিরেকী বলা হয়।
হেত্বাভাস: হেতু + আভাস = হেত্বাভাস । যে অনুমানের হেতু প্রকৃতপক্ষে হেতু নয়, হেতুর আভাস মাত্র, সেই অনুমান ভ্রান্তিজনক এবং এই ভ্রান্তির নাম হেত্বাভাস। হেত্বাভাস পাঁচ প্রকার। যথা- ১.সব্যভিচার হেত্বাভাস, ২.বিরুদ্ধ হেত্বাভাস, ৩.সৎপ্রতিপক্ষ হেত্বাভাস, ৪.অসিদ্ধ হেত্বাভাস, ৫.বাধিত হেত্বাভাস।
আরও পড়ুন: নববৈপল্য সূত্র কি? এর সংক্ষিপ্ত বিবরন
৩.উপমান
নৈয়ায়িক গণের মতে উপমান ও যথার্থ জ্ঞান লাভের উপায় বা প্রমান। পরিচিত কোন বস্তুর সঙ্গে অপরিচিত কোন বস্তুর সাদৃশ্য লক্ষ্য করে ঐ অপরিচিত বস্তুটি সম্পর্কে জ্ঞান লাভের যে পদ্ধতি তাকে বলা হয় উপমান এবং উপমানলব্ধ জ্ঞানকে বলা হয় উপমিতি। নৈয়ায়িকান উপমাকে জ্ঞানলাভের একটি উপায় বা প্রমান হিসেবে স্বীকার করলেও ভারতের অন্যান্য দার্শনিক সম্প্রদায় এটিকে প্রমাণ বলে স্বীকার করেন নি। চার্বাকদের মতে প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ। সুতরাং উপমানকে তারা প্রমানরূপে স্বীকার করেন না। বৌদ্ধ দার্শনিকগণ উপমানকে প্রত্যক্ষ ও শব্দের অন্তর্গত বলে মনে করেন। বৈশেষিক ও সাংখ্য দার্শনিকগণ উপমানকে অনুমানেরই একটি বিশেষ রূপ বলেছেন। জৈনদের মতে উপমান প্রত্যভিজ্ঞারই অন্তর্গত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, চার্বাক, বৌদ্ধ, জৈন, বৈশেষিক ও সাংখ্য এই সকল দর্শনের কোনোটিই উপমানকে স্বতন্ত প্রমাণেরূপে স্বীকার করেননি। মীমাংসা এবং বেদান্ত দর্শন উপমানকে স্বতন্ত্র প্রমাণরূপে স্বীকার করলেও তাদের ব্যাখ্যা ন্যায়দর্শন প্রদত্ত উপমানের ব্যাখ্যার সঙ্গে মিল নেই।
৪.শব্দ
নৈয়ায়িক দের মতে শব্দও যথার্থ জ্ঞানলাভের একটি স্বতন্ত্র প্রমান। তাদের মতে শব্দ হল বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তির বচন বা আপ্তবাক্য। আপ্তব্যক্তি হলেন তিনিই, যিনি সত্য জানেন এবং সত্য বলেন। শব্দ বা আপ্তবাক্য হতে যে জ্ঞান লাভ করা যায় তাই শব্দ জ্ঞান। যে সব বিষয় সম্পর্কে প্রত্যক্ষ, অনুমান ও উপমানের দ্বারা জ্ঞান লাভ করা যায় না সেই সব বিষয় সম্পর্কে শব্দের সাহায্যে জ্ঞান লাভ করা যায়। শব্দ–জ্ঞানের যথার্থ একটি প্রধান শর্তের উপর নির্ভর করে এবং সেই শর্তটি হল, আপ্তবাক্যের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা। শব্দ প্রমাণ দুই প্রকার। যথা- দৃষ্টার্থ ও অদৃষ্টাৰ্থ
ক.দৃষ্টার্থ: ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে আপ্ত–ব্যক্তির যে বচন তাই দৃষ্টার্থ শব্দ প্ৰমাণ।
খ.অদৃষ্টার্থ: প্রত্যক্ষযোগ্য নয় এমন কোন বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে আপ্ত–ব্যক্তির যে বচন তাই অদৃষ্টার্থ শব্দ প্রমাণ।
আর এক দিক হতে শব্দ দুই ভাগ। যথা- লৌকিক ও বৈদিক।
ক.লৌকিক: সাধারণ বিশ্বস্ত ব্যক্তির যে বচন তা লৌকিক শব্দ প্রমাণ।
খ.বৈদিক: বেদের যে বচন তা বৈদিক শব্দ প্রমাণ। মানুষ ভূল করতে পারে, তাই লৌকিক শব্দ প্রমাণ হতে যে জ্ঞান লাভ করা যায় তা ভ্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে। তবে বৈদিক শব্দ–প্রমাণলব্ধ যে জ্ঞান তা ভ্রান্ত হতে পারে না। কারণ বেদ ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং বেদের বাণী ঈশ্বরেরই বচন, তাই অভ্রান্ত।
উপসংহার
ন্যায়দর্শনে বস্তুতত্ত্ব জ্ঞানতত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এই দর্শনে জ্ঞানের সংজ্ঞা, জ্ঞানের প্রকারভেদ, যথার্থ জ্ঞান ও অযথার্থ জ্ঞানের প্রকৃতি কী এবং এদের মধ্যে পার্থক্য কী তা বিস্তৃত আলোচনা করা হয়।
সম্পর্কিত আর্টিকেল
অনুপ্রাস বলতে কি বোঝ? অনুপ্রাস কত প্রকার ও কি কি?